এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের পূর্বাভাস

রেকর্ড ১২ লাখ কোটি ডলার ছাড়াবে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ

বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ এরই মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত কয়েক বছরে একাধিক ফোরামে বৈশ্বিক সংস্থাগুলো ঋণ কমাতে সরকারগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে।

বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ এরই মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত কয়েক বছরে একাধিক ফোরামে বৈশ্বিক সংস্থাগুলো ঋণ কমাতে সরকারগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে পরিস্থিতি এসব পরামর্শের অনুকূলে নেই। চলতি বছর সরকারি ঋণ বেড়ে রেকর্ড পরিমাণ হতে পারে বলে এক পূর্বাভাসে জানিয়েছে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস। আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর বৈশ্বিক সরকারি ঋণ ১২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন বা ১২ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে। ঋণের ঊর্ধ্বগতি বিষয়ে প্রতিবেদনে দুটি বিষয় উঠে এসেছে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয় প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য খরচ বাড়ছে। এর সঙ্গে উচ্চ সুদহার ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে তুলছে। খবর এফটি।

এসঅ্যান্ডপির পূর্বাভাস অনুসারে, ১৩৮টি দেশে চলতি বছর সরকারি বন্ড ইস্যু ৩ শতাংশ বাড়লে মোট ঋণের পরিমাণ ৭৬ লাখ ৯০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছবে। বৈশ্বিক আর্থিক সংকট, কভিড-১৯ মহামারী ও ইউরোপের প্রতিরক্ষা খরচ বাড়ানোর কারণে ঋণের পরিমাণ বাড়ছে।

ঋণমান সংস্থাটির সভরেন বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান রবার্তো সিফন-আরেভালোর মতে, বড় অর্থনীতিগুলো একের পর এক সংকটের মুখে পড়ছে। এসব সংকট মোকাবেলার জন্য তারা বর্ধমানশীল আর্থিক নীতির ওপর নির্ভর করছে। ফলে অনেক বেশি ঋণ তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, ঋণ পরিশোধ বাবদ ব্যয় বৃদ্ধি এ পরিস্থিতিকে আরো খারাপ দিকে নিয়ে গেছে। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বন্ড কেনার প্রোগ্রাম শেষ হওয়ার পর বন্ডের ইল্ড উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সিফন-আরেভালোর মতে, মহামারীর আগে ঋণ বাবদ খরচের পরিমাণ কম ছিল। তাই তখন অতিরিক্ত সরকারি ব্যয়ের জন্য ঋণগ্রহণ ছিল টেকসই সিদ্ধান্ত। কিন্তু এখন উচ্চ সুদহার সমস্যা বড় করে তুলেছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও চীনের মতো অর্থনীতি তখন ঋণ নিতে তেমন সমস্যায় পড়ত না। কারণ বিনিয়োগকারীরা কম সুদে বন্ড কিনতে আগ্রহী ছিল।

এদিকে বড় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সরকারের বাজেট ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ সরকারগুলো অতিরিক্ত ঋণ নিচ্ছে ও বাজেট ঘাটতি বেড়ে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ কঠিন করে তুলতে পারে। গত ডিসেম্বরে বন্ড জায়ান্ট পিমকো জানায়, তারা দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন বন্ড কেনা কমাবে। কারণ এগুলো টেকসই নাও হতে পারে। বিলিয়নেয়ার বিনিয়োগকারী রে ডালিও সতর্ক করেছেন, ‘ঋণের মৃত্যুকূপে’ প্রবেশের ঝুঁকিতে রয়েছে যুক্তরাজ্য। এর অর্থ হলো, ব্রিটিশ সরকারকে ক্রমাগত ঋণ নিতে হবে এবং এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বন্ড বিক্রির চক্র সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্বের বৃহত্তম ঋণগ্রহীতা যুক্তরাষ্ট্রে বিস্তৃত বাজেট ঘাটতি, সুদ বাবদ বড় অংকের অর্থ পরিশোধ ও বিপুল পরিমাণের ঋণে পুনঃঅর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এসঅ্যান্ডপি পূর্বাভাস অনুসারে, এসব মিলিয়ে দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ৯০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে। ঋণমান সংস্থাটি তাদের হিসাবে স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বিল ও স্থানীয় সরকার ঋণ অন্তর্ভুক্ত করেনি।

পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে মার্কিন সরকারের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৬ শতাংশের বেশি থাকবে। তবে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের অবস্থান বহাল থাকায় মার্কিন অর্থনীতিতে ‘উল্লেখযোগ্য নমনীয়তা’ থাকবে।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঋণগ্রহীতা চীন। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার জন্য দেশটি কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ৩৭ হাজার কোটি ডলারের বেশি বেড়ে চলতি বছর ২ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে। অবশ্য জি৭ জোটভুক্ত দেশ ও চীনের বাইরে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে ঋণের পরিমাণ মোটামুটি স্থিতিশীল থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এসঅ্যান্ডপির মতে, চলতি বছর বৈশ্বিক জিডিপির তুলনায় মোট ঋণের পরিমাণ ৭০ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছবে, যা ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বেশি। তবে ২০২০ সালের তুলনায় কম। ওই সময় মহামারী মোকাবেলায় ব্যাপক সরকারি ব্যয়ের ফলে বৈশ্বিক জিডিপির তুলনায় মোট ঋণ পৌঁছে ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটের পর বেশ কয়েকটি বৃহৎ অর্থনীতির ঋণমানে উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটেছে। শীর্ষ এএএ রেটিংধারী ঋণগ্রহীতাদের হিস্যা কমেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশ শীর্ষ শ্রেণী থেকে বেরিয়ে এসেছে। এ দেশগুলোর ঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ঝুঁকি বেড়েছে।

এসঅ্যান্ডপি জানিয়েছে, সরকারি ঋণের সরবরাহ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগকারীদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বন্ডের ইল্ড তীব্র করে তুলছে এবং অনেক উন্নত অর্থনীতির বাজেট ঘাটতি বিনিয়োগকারীদের মাঝে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

সিফন-আরেভালো জানান, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঋণ গ্রহণের আগ্রহ থাকলেও এ বাবদ খরচ বাড়ায় অবকাঠামো বিনিয়োগের মতো সরকারের অন্যান্য লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বিশাল বাজেট ঘাটতি ও ঋণ বাড়ার কারণে অর্থনৈতিকভাবে আরো সংযত নীতির পক্ষে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক আন্দোলন বেড়েছে।’

আরও